Tom Regan: The Philosophy of Animal Rights

প্রাণী-অধিকার দর্শন

মূল: ড. টম রেগান

ভাষান্তর: পলাশ কান্তি বিশ্বাস

 

This pamphlet was originally published and distributed by the Culture and Animals Foundation. The present translation is reproduced with permission of the Culture and Animals Foundation. The English original, The Philosophy of Animal Rights, is available here.

Advertisements

Animal Rights

প্রাণী-অধিকার দৃষ্টিভঙ্গি

অন্য যেসব প্রাণীকে মানুষ খায়, বিজ্ঞানে ব্যবহার করে, শিকার করে, ফাঁদ পেতে ধরে এবং বিচিত্র উপায়ে শোষণ করে, আমাদের কাছে তাদের উপযোগিতা ছাড়াও তাদের একটি স্বকীয় জীবন রয়েছে যা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে শুধু পৃথিবীর মাঝে অস্তিত্বশীল তা-ই নয়, তারা এ ব্যাপারে অবগতও বটে। তাদের জীবনে যা ঘটে তা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের একটি জীবন আছে যা জীবনধারীর কাছে উৎকৃষ্টতর বা নিকৃষ্টতররূপে প্রতিভাত হতে পারে।

সেই জীবনে আছে বিবিধ জৈবিক, ব্যক্তিক এবং সামাজিক চাহিদা। এসব চাহিদা পূরণ হলে তারা আনন্দ পায়, পূরণ না হলে বা তাদের অপপ্রয়োগ হলে তারা বেদনা অনুভব করে। এসকল মৌলিক দিক বিবেচনায়, অন্যদের মত, গবেষণাগার ও খামারের মানবেতর প্রাণী এবং মানুষ একইরকম। এবং একারণেই তাদের সঙ্গে এবং আমাদের পরস্পরের সঙ্গে আমাদের আচরণের ক্ষেত্রে অভিন্ন মৌলিক নৈতিক নীতি স্বীকার করে নিতে হবে।

মানব নীতিবিদ্যা, এর গভীরতম স্তরে, ব্যক্তির স্বতন্ত্র মূল্যের উপর প্রতিষ্ঠিত; কোন একজন মানুষ অন্য মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে কতটা দরকারী তা দিয়ে ঐ মানুষটির নৈতিক মূল্য পরিমাপ করা যায় না। মানুষের স্বতন্ত্র মূল্যের জন্যে সম্মানজনক নয় এমন কোনভাবে তার সঙ্গে আচরণ করার অর্থ হলো সেই মৌলিকতম মানবাধিকার  –  প্রত্যেক ব্যক্তির সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার  –  লঙ্ঘন করা।

প্রাণী-অধিকার দর্শন কেবল এই দাবি করে যে যুক্তিকে সম্মান দেওয়া হোক। কারণ যে যুক্তি মানুষের স্বতন্ত্র মূল্যকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে, সেরকম যেকোন যুক্তি এই ইঙ্গিত করে যে অন্য প্রাণীরও এই একই মূল্য আছে, এবং সমানভাবে আছে। এবং যে যুক্তি মানুষের সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকারকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে, সেরকম যেকোন যুক্তি এই ইঙ্গিতও দেয় যে অন্য প্রাণীকুলেরও এই একই অধিকার আছে, এবং সমভাবেই আছে।

অতএব, একথা সত্য যে, নারীর অস্তিত্ব পুরুষের সেবাদাসী হওয়ার জন্যে নয়, কৃষ্ণাঙ্গের জন্ম শ্বেতাঙ্গের সেবার্থে নয়, দরিদ্রের অস্তিত্ব ধনীর গোলামি করার জন্যে নয়, অথবা দুর্বলের জীবন সবলের সেবা করার জন্যে নয়। প্রাণী-অধিকার দর্শন যে কেবল এসব সত্য স্বীকার করে তা-ই নয়, বরং এগুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং এগুলোর ন্যায্যতা প্রমাণ করে। কিন্তু এই দর্শন আরো বেশি কিছু করে। অন্য প্রাণীর স্বতন্ত্র মূল্য ও অধিকারের উপর গুরুত্বারোপ ও সেগুলোর ন্যায্যতা প্রমাণ করার মাধ্যমে এই দর্শন বিজ্ঞানের তথ্যসমৃদ্ধ এবং নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ যুক্তিমালা প্রদর্শন করে এবং, ফলত, একথা অসত্য বলে ঘোষণা করে যে এসব প্রাণী আমাদের সেবা করার উদ্দেশ্যে অস্তিত্বশীল।

এই সত্য একবার স্বীকার করে নিলে একথা সহজবোধ্য হয় কেন প্রাণী-অধিকার দর্শন অন্য প্রাণীকুলের উপর চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যেকটি অন্যায়ের প্রতিবাদে অবিচল। ন্যায়ের দাবি এটা নয় যে বিজ্ঞানের মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রাণীদের জন্যে খাঁচা হোক বৃহত্তর ও অধিকতর পরিচ্ছন্ন, বরং ন্যায়ের দাবি শূন্য খাঁচা; ন্যায়ের দাবি “প্রথাগত” প্রাণীপালন নয়, বরং মৃত প্রাণীর মাংসের সকল রকম বাণিজ্যের সম্পূর্ণ সমাপ্তি; “অধিকতর সহানুভূতিশীল” শিকারকরণ এবং ফাঁদবদ্ধকরণ নয়, বরং এইসব বর্বরোচিত রেওয়াজের সামগ্রিক নির্মূলীকরণ।

কারণ যখন কোন অন্যায় চরমে ওঠে, তখন সর্বশক্তি দিয়ে তাকে প্রতিরোধ করতে হয়। ন্যায়ের যা দাবি ছিল তা “শোধিত” দাসপ্রথা নয়, “শোধিত” শিশুশ্রম নয়, নয় নারীর “শোধিত” পীড়ন। এসব ক্ষেত্রের প্রত্যেকটিতে, বিলুপ্তিসাধনই ছিল একমাত্র নৈতিক সমাধান। চরম অন্যায়কে কেবল শোধন করার অর্থ হল অন্যায়কে দীর্ঘায়িত করা।

অন্য প্রাণীকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগানোর প্রতিবাদে প্রাণী-অধিকার দর্শনের দাবি এই একই সমাধান – বিলুপ্তিসাধন। অন্যায়ভাবে কাজে লাগানোর দিকগুলি পরিবর্তন করলেই চলবে না। অন্যায়ভাবে কাজে লাগানোটাই উচ্ছেদ করতে হবে, তা সেই অন্যায় খামারে হোক, গবেষণাগারে হোক বা অরণ্যে হোক। প্রাণী-অধিকার দর্শন আর কিছু দাবি করে না, তবে এই দর্শন এর চেয়ে কম কিছুতেও সন্তুষ্ট হবে না।

Reasons for

প্রাণী-অধিকারের পক্ষে ১০টি যুক্তি এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা

১. প্রাণী-অধিকার দর্শন যৌক্তিক।

ব্যাখ্যা: যথেচ্ছভাবে বৈষম্য নির্ধারণ করা অযৌক্তিক, এবং মানবেতর প্রাণীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ স্বেচ্ছাচারমূলক। দুর্বলতর মানুষের সঙ্গে, বিশেষত যাদের স্বাভাবিক মানব বুদ্ধিমত্তা নেই তাদের সঙ্গে, এমনভাবে আচরণ করা অন্যায় যাতে মনে হয় যে তারা আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের ‘হাতিয়ার’ বা ‘নবায়নযোগ্য কাঁচামাল’ বা ‘মডেল’ বা ‘পণ্য’। কাজেই, অন্যান্য প্রাণীকে ‘হাতিয়ার’ বা ‘মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে সেইমত আচরণ করা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না যদি তাদের মনস্তত্ত্ব এইসব মানুষের মত উন্নত (বা তাদের চেয়ে উন্নততর) হয়। অন্যভাবে চিন্তা করা অযৌক্তিক।

কোন প্রাণীকে চরম জটিল এক ভৌত-রাসায়নিক কাঠামো বলে অভিহিত করা নিশ্চয়ই সম্পূর্ণরূপে সঠিক, যদি না এই অভিধা প্রাণীটির ‘প্রাণীত্ব’-কে উপেক্ষা করে।
(ই. এফ. সুমাখার)

২. প্রাণী-অধিকার দর্শন বিজ্ঞানসম্মত।

ব্যাখ্যা: প্রাণী-অধিকার দর্শন সামগ্রিকভাবে আমাদের উৎকৃষ্টতম বিজ্ঞানের প্রতি এবং বিশেষভাবে বিবর্তন জীববিদ্যার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ডারউইনের ভাষায়, বিবর্তন জীববিদ্যা শেখায় যে, মানুষ অন্য প্রাণী থেকে মাত্রাগতভাবে ভিন্ন, জাতিগতভাবে নয়। ভেদরেখাসংক্রান্ত প্রশ্নমালা একপাশে সরিয়ে রাখলে, এটা সুস্পষ্ট যে, অন্য প্রাণীদের মত, গবেষণাগারে ব্যবহৃত বা খাদ্যের জন্যে পালিত প্রাণীরা, এবং ফূর্তির জন্যে শিকারকৃত বা মুনাফার জন্যে ফাঁদে ধরা প্রাণীরা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞাতি। এটা কোন অবাস্তব কল্পনা নয়, এটা আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত বাস্তবতা।

মানসিক বৃত্তির দিক থেকে মানুষ এবং উন্নততর স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই।
(চার্লস ডারউইন)

৩. প্রাণী-অধিকার দর্শন পক্ষপাতমুক্ত।

ব্যাখ্যা: জাতিবাদী হলো সেইসব লোক যারা মনে করে যে তাদের জাতির সদস্যরা কেবল তাদের (“উৎকৃষ্টতর”) জাতিটির অন্তর্ভুক্ত বলেই অন্য সকল জাতির সদস্যদের তুলনায় উৎকৃষ্টতর। লিঙ্গবাদীরা বিশ্বাস করে যে তাদের লিঙ্গগোষ্ঠীর সদস্যরা শুধু তাদের (‘উৎকৃষ্টতর’) লিঙ্গটির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণেই বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের চেয়ে উৎকৃষ্টতর। জাতিবাদ এবং লিঙ্গবাদ উভয়ই অসমর্থনীয় গোঁড়ামির দৃষ্টান্ত। কোন “উৎকৃষ্টতর’’ বা “নিকৃষ্টতর’’ লিঙ্গগোষ্ঠী বা জাতি নেই। জাতিগত বা লৈঙ্গিক পার্থক্য আসলে জৈবিক পার্থক্য, নীতিগত পার্থক্য নয়।

প্রজাতিবাদ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য যে মতবাদ মনে করে হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির সদস্যরা অন্য প্রত্যেক প্রজাতির সদস্যদের তুলনায় উৎকৃষ্টতর কেবল এই কারণে যে মানুষ তার নিজের (‘উৎকৃষ্টতর’) প্রজাতিভুক্ত। অন্যভাবে চিন্তা করা জাতিবাদী বা লিঙ্গবাদীর তুলনায় কম পক্ষপাতদুষ্ট হবে না।

আপনি যদি মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে কৃত হত্যাকে ন্যায্য প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আপনি ঘেটোর (ghetto) দুর্দশাকেও ন্যায্য বলে প্রমাণ করতে পারেন। আমি কোনটির ন্যায্যতাই প্রমাণ করতে পারি না।
(ডিক গ্রেগরি)

৪. প্রাণী-অধিকার দর্শন ন্যায়সম্মত।

ব্যাখ্যা: ন্যায় হলো নীতিবিদ্যার পরম আদর্শ। কারও উপকার হতে পারে বলে আমরা অন্যায় করতে পারি না বা অন্যায় হতে দিতে পারি না। তেমনি অনেকে উপকৃত হতে পারে মনে করে আমরা কতিপয়ের অধিকার লঙ্ঘন করতে পারি না। ক্রীতদাসপ্রথায় এই অধিকার-লঙ্ঘন হয়েছিলো। শিশুশ্রমব্যবস্থাও এটা অনুমোদন করেছিলো। সামাজিক অন্যায়ের অধিকাংশ দৃষ্টান্তে এটাই ঘটেছিলো। কিন্তু যার পরম আদর্শ ন্যায়ের আদর্শ, সেই প্রাণী-অধিকার দর্শন এই অন্যায় হতে দিতে পারে না: অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে উপকৃত হওয়ার অধিকার কারও নেই, তা সেই ‘অন্য’ কোন মানুষ হোক বা অন্য কোন প্রাণী।

শিশুদের অনুকূলে আইনগত হস্তক্ষেপের কারণগুলো সমান যথাযোগ্যভাবেই সেইসব হতভাগ্য দাসদের – (অন্য) প্রাণীদের – ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
(জন স্টুয়ার্ট মিল)

৫. প্রাণী-অধিকার দর্শন করুণাপূর্ণ।

ব্যাখ্যা: একটি যথার্থ মানবজীবনের জন্যে অপরিহার্য হলো অন্যায়ের ফলে ভুক্তভোগী যারা, ভুক্তভোগীরা মানুষ হোক বা অন্য প্রাণী, তাদের প্রতি অনুকম্পা ও সহানুভূতি – এক কথায়, সহমর্মিতা – প্রকাশ করা। প্রাণী-অধিকার দর্শন সহমর্মিতা নামক সদ্গুণের দাবি করে এবং এই দর্শন গ্রহণ সদ্গুণটির ক্রমবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। লিঙ্কনের ভাষায় বলতে গেলে, এই দর্শন “একজন পরিপূর্ণ মানুষের জীবনরীতি”।

কর্মে সহৃদয়তা হতে পারে সেই অসামান্য সম্ভাবনা যা আমাদের এই জনাকীর্ণ, কলুষিত গ্রহকে রক্ষা করতে পারবে।
(ভিক্টোরিয়া মোর‌্যান)

৬. প্রাণী-অধিকার দর্শন নিঃস্বার্থ।

ব্যাখ্যা: যারা দুর্বল ও অসহায়, মানুষ হোক বা অন্য প্রাণী, যাদের নিজেদের পক্ষে কথা বলার বা নিজেদেরকে রক্ষা করার সামর্থ্য নেই, এবং মানুষের লোভ ও নিষ্ঠুরতা থেকে যাদের সুরক্ষা দরকার তাদেরকে সেবা করার অঙ্গীকার প্রাণী-অধিকার দর্শনের দাবি। এই দর্শন এই অঙ্গীকারের দাবি করে, এই কারণে নয় যে এই অঙ্গীকার আমাদের আত্ম-স্বার্থসহায়ক, বরং এই কারণে যে এটাই ন্যায়সঙ্গত। এই দর্শন তাই নিঃস্বার্থ সেবাকর্মের দাবি করে, এবং এই দর্শন গ্রহণ তাই নিঃস্বার্থ সেবাকর্মের ক্রমবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে।

আমাদের এমন একটি নীতিদর্শন দরকার যেখানে, বর্তমানে দার্শনিকদের দ্বারা প্রায় অনুল্লিখিত, প্রেমের নীতিকে আবার প্রধান নীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
(আইরিশ মারডক)

৭. প্রাণী-অধিকার দর্শন ব্যক্তির পূর্ণবিকাশে সহায়ক।

ব্যাখ্যা: নীতিবিদ্যার সকল গুরুত্বপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয়, ধারা চারটি বিষয়ের উপর জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করে: জ্ঞান, ন্যায়, সহমর্মিতা এবং স্বশাসন। প্রাণী-অধিকার দর্শন কোন ব্যতিক্রম নয়। এই দর্শন আমাদেরকে এটা শিক্ষা দেয় যে আমাদের বিকল্প-নির্বাচনগুলো জ্ঞানভিত্তিক হওয়া উচিত, সহমর্মিতা ও ন্যায়কে প্রকাশ করা উচিত, এবং স্বাধীন হওয়া উচিত। এইসব সদ্গুন অর্জন করা, এবং লোভ ও নির্লিপ্ততার প্রতি মানুষের সহজপ্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। কিন্তু এগুলো ছাড়া সার্বিক মানব জীবন সম্ভব নয়। প্রাণী-অধিকার দর্শন ব্যক্তির পূর্ণ আত্মবিকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, এবং এই দর্শন গ্রহণ ব্যক্তির পূর্ণ আত্মবিকাশের ক্রমোন্নতির সহায়ক।

মানবিকতা কোনো মৃত আরোপিত নিয়ম নয়, বরং অন্তরের প্রাণবন্ত প্রবৃত্তি; আত্ম-বিসর্জন নয়, বরং পূর্ণ আত্মবিকাশ।
(হেনরি সল্ট)

৮. প্রাণী-অধিকার দর্শন সামাজিকভাবে প্রগতিশীল।

ব্যাখ্যা: মানব সমাজের বিকাশের পথে বৃহত্তম প্রতিবন্ধক হলো মানুষের হাতে অন্য প্রাণীর শোষণ। এই কথা অস্বাস্থ্যকর খাবার, বিজ্ঞানে ‘সম্পূর্ণ প্রাণী মডেলের’ উপর অভ্যাসগত নির্ভরশীলতা, এবং প্রাণী শোষণের আরো অনেক রূপের ক্ষেত্রে সত্য। এবং শিক্ষা ও বিজ্ঞাপনের মত দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রেও এই কথা একইভাবে সত্য, যেগুলো মানবাত্মাকে যুক্তি, নিরপেক্ষতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়ের দাবির প্রতি সংবেদনহীন করতে প্ররোচিত করে। এই সকল (এবং ততোধিক) প্রকারে, জাতিসমূহ ভীষণভাবে পশ্চাৎপদ থেকে যায়, কারণ তারা তাদের নাগরিকদের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করতে পারে না।

কোন জাতি তার প্রাণীদের প্রতি কেমন আচরণ করে তার দ্বারা ঐ জাতির মহত্ত্ব এবং নৈতিক প্রগতি পরিমাপ করা যায়।
(মহাত্মা গান্ধী)

৯. প্রাণী-অধিকার দর্শন পরিবেশের দিক থেকে সুবিবেচক।

ব্যাখ্যা: পরিবেশের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত কার যায় প্রাণীর শোষণকে; এবং এই অবনতির দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া, পাণি দূষণ, এবং আবাদী জমি ও উপরিস্তরের উর্বর মাটির বিনাশকে অন্তর্ভূক্ত করা যায়। এই একই ধারা বিদ্যমান রয়েছে পরিবেশগত সমস্যার বিস্তৃত পরিসর জুড়ে, অম্ল বৃষ্টি এবং সমুদ্রে বিষাক্ত বর্জ্য নিক্ষেপ থেকে শুরু করে বায়ু দূষণ এবং প্রাকৃতিক বসতির বিনাশ পর্যন্ত। এই সকল ক্ষেত্রে, আক্রান্ত প্রাণীদেরকে (পরিবেশের বিপর্যয়ে তারাই তো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মারা যায়) রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করার অর্থ হলো পৃথিবীকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করা।

এই যন্ত্রণাগ্রস্ত গ্রহপৃষ্ঠে জীবনের রৌদ্র-ছায়াকে যারা আমাদের সঙ্গে যৌথভাবে উপভোগ করে, সেই নশ্বর সঙ্গী-প্রাণীকুল এবং আমাদের নিজেদের প্রজাতির মধ্যে যতক্ষণ না আমরা উপলব্ধিজাত জ্ঞাতিত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, ততক্ষণ অন্যান্য প্রজাতির কোন আশা-ভরসা নেই, পরিবেশের কোন আশা-ভরসা নেই, এবং আমাদের নিজেদেরও কোন আশা-ভরসা নেই।
(জন ওয়েন-টাইসন)

১০. প্রাণী-অধিকার দর্শন শান্তিপ্রিয়।

ব্যাখ্যা: প্রাণী-অধিকার দর্শনের মৌলিক দাবি হলো মানুষ এবং অন্য প্রাণীকুলের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা। এই আচরণের দাবি হলো আমরা নিজেরা বা অন্যরা উপকৃত হতে পারে কেবল এই কারণে যেন আমরা অন্যের ক্ষতি না করি। এই দর্শন তাই সামরিক আগ্রাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা শান্তির দর্শন। কিন্তু এটা এমন একটা দর্শন যার শান্তির দাবি আমাদের প্রজাতির সীমারেখা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কারণ, লক্ষ লক্ষ অগণিত মানবেতর প্রাণীর বিরুদ্ধে প্রতিদিন যুদ্ধ চালানো হচ্ছে। তাই, প্রকৃত অর্থে শান্তির পক্ষে অবস্থান করার অর্থ হলো প্রজাতিবাদের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় অবস্থান। অন্য প্রাণীকুলের সঙ্গে আমাদের আচরণ যদি আমরা বন্ধুভাবাপন্ন করতে না পারি, তাহলে এটা বিশ্বাস করা অবাস্তব স্বপ্নকল্পনা হবে যে, পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করতে পারে।

আমাদের জীবনসংগ্রামে কোন অলৌকিক উপায়ে পৃথিবী যদি পারমাণবিক বিপর্যয়ের থেকে রেহাইও পায়, তাহলে প্রত্যেক জীবের প্রতি ন্যায়ই কেবল মানবপ্রজাতিকে রক্ষা করতে পারবে।
(এ্যালিস ওয়াকার)

Reasons against

প্রাণী-অধিকারের বিপক্ষে ১০টি যুক্তি এবং সেগুলোর প্রত্যুত্তর

১. আপনি প্রাণীকুল এবং মানুষকে সমতুল্য মনে করছেন যদিও বস্তুত মানুষ এবং প্রাণীকুল ভীষণভাবে ভিন্ন।

উত্তর: আমরা এটা বলছি না যে মানুষ এবং অন্য প্রাণী সকল দিক দিয়ে সমান। যেমন, আমরা এটা বলছি না যে কুকুর এবং বিড়াল ক্যালকুলাস করতে পারে, কিংবা শুকর এবং গরু কবিতা উপভোগ করতে পারে। আমরা যা বলছি তা হলো, মানুষের মত আরো অনেক প্রাণী মনস্তাত্ত্বিক জীব, যাদের রয়েছে নিজস্ব অভিজ্ঞামূলক কল্যাণ। এই অর্থে তারা এবং আমরা অভিন্ন। সুতরাং, এই অর্থে, আমাদের মধ্যকার অনেক পার্থক্য সত্ত্বেও, তারা এবং আমরা সমান।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার সমস্ত যুক্তি এই কঠোর সত্যকে নাকচ করতে পারে না যে যন্ত্রণাভোগের দিক থেকে প্রাণীকুল আমাদের সমান।
(পিটার সিঙ্গার)

২. আপনি বলছেন যে প্রত্যেক মানুষ এবং প্রতিটি অন্য প্রাণীর একই অধিকার আছে, যা উদ্ভট। মুরগির ভোটাধিকার থাকতে পারে না, শুকরেরও উচ্চশিক্ষার অধিকার থাকতে পারে না।

উত্তর: আমরা এটা বলছি না যে সকল ক্ষেত্রে মানুষ এবং অন্য প্রাণীর একই অধিকার আছে। এমনকি এটাও নয় যে সকল মানুষের একই অধিকার আছে। যেমন, গুরুতরভাবে মানসিক প্রতিবন্ধীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার থাকে না। আমরা যা বলছি তা হলো, এইসব প্রতিবন্ধী এবং অন্য মানুষের মত অন্যান্য প্রাণীরও অভিন্ন মৌলিক নৈতিক অধিকার আছে – অর্থাৎ সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার।

প্রতিটি সত্যবাণীর ভাগ্যই এমন যে, উপহাসের পাত্র হয়ে সে প্রথমে প্রকাশ পায়।
(অ্যালবার্ট স্যুইটজার)

৩. প্রাণীদের যদি অধিকার থাকে তাহলে তো শাকশব্জিরও অধিকার থাকে, যা হাস্যকর।

উত্তর: অনেক প্রাণী আমাদেরই মতো; তাদের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণ রয়েছে। কাজেই আমাদের মত এইসব প্রাণীরও সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার আছে। পক্ষান্তরে, আমাদের একথা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই, এবং নিঃসন্দেহে কোন বৈজ্ঞানিক কারণ নেই, যে গাজর ও টমেটোর মত শব্জি পৃথিবীতে কোন মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্ব নিয়ে আসতে পারে। অন্য সব শব্জির মত, গাজর ও টমেটোতেও মগজ বা কেন্দ্রীয় ¯œায়ুতন্ত্রের অনুরূপ কোন কিছু অনুপস্থিত। শব্জির মধ্যে যেহেতু এগুলো নেই, তাই শব্জিকে আনন্দ এবং বেদনার মত আবেগের অভিজ্ঞতা লাভে সমর্থ মনস্তাত্ত্বিক সত্তা বলে বিবেচনা করার কোন কারণ নেই। এইসব কারণেই কেউ প্রাণীর ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে অধিকার দাবি করতে পারেন এবং শাকশব্জির ক্ষেত্রে তা অস্বীকার করতে পারেন।

প্রাণী-অধিকার ব্যাপারটি কেবল সংবেদিতার প্রয়োজনীয়তার উপরেই নির্ভরশীল।
(এ্যানড্রু লিনজে)

৪. আপনি তাহলে কোথায় সীমারেখা টানবেন? প্রাইমেট এবং ইদুরজাতীয় প্রাণীর যদি অধিকার থাকে, তাহলে তো শামুকজাতীয় প্রাণী এবং এ্যামিবারও অধিকার থাকে, যা হাস্যকর।

উত্তর: ঠিক কোথায় ‘সীমারেখা টানতে হবে’ তা জানা প্রায়শই সহজ নয়। যেমন, কাউকে বৃদ্ধ হতে হলে ঠিক কতটা বয়স্ক হতে হবে, অথবা লম্বা হতে গেলে ঠিক কতটা দীর্ঘকায় হতে হবে তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু আমরা নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি যে যার বয়স আটাশি বছর তিনি বৃদ্ধ, এবং যার উচ্চতা সাত ফুট এক ইঞ্চি তিনি লম্বা। অনুরূপভাবে, মনস্তত্ত্বসমৃদ্ধ প্রাণীদের প্রসঙ্গ উঠলে ঠিক কোথায় সীমারেখা টানতে হবে তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে যেখানেই সীমারেখা টানা হোক না কেন, তার একদিকে (মনস্তাত্ত্বিক দিকে) থাকবে প্রাইমেট ও তীক্ষ্ণদন্ত প্রাণী এবং অন্যদিকে থাকবে শামুকজাতীয় প্রাণী ও এ্যামিবা – যার অর্থ এটা নয় যে আমরা এদেরকে নির্বিচারে হত্যা করতে পারি।

প্রাণীকুলের সঙ্গে, পুষ্পরাজির সঙ্গে, সকল সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নৈতিক আচরণবিধি রয়েছে যা আজ পর্যন্ত বিবেচনায় আনা হয় নি বললেই চলে।
(ভিক্টর হুগো)

৫. কিন্তু নিশ্চয়ই এমন কিছু প্রাণী আছে যাদের বেদনানুভূতি আছে অথচ সমন্বিত মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় নেই। যেহেতু এসব প্রাণীর সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার নেই, সেহেতু প্রাণী-অধিকার দর্শনের মতে আমরা তাদের সঙ্গে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আচরণ করতে পারি।

উত্তর: একথা সত্য যে, চিংড়ি এবং ঝিনুকজাতীয় কিছু প্রাণীর বেদনা অনুভবের সামর্থ্য থাকলেও অন্য অধিকাংশ মনস্তাত্ত্বিক সামর্থ্য নেই। একথা যদি সত্য হয়, তাহলে তাদের কিছু কিছু অধিকার থাকবে না যেগুলো অন্য প্রাণীদের আছে। কিন্তু অহেতুক কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া নৈতিকভাবে একেবারেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এবং যেহেতু চিংড়ি, ঝিনুক এবং অনুরূপ প্রাণী খাওয়া বা অন্যভাবে তাদেরকে ব্যবহার করা মানুষের জন্যে আবশ্যক নয়, তাই তাদেরকে এমন ব্যবহারের সঙ্গে অনিবার্যভাবে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রণা দেওয়ার কোন নৈতিক ন্যায্যতা থাকতে পারে না।

প্রশ্ন এটা নয় যে, ‘তারা কি বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে পারে?’ প্রশ্ন এটাও নয় যে, ‘তারা কি কথা বলতে পারে?’ বরং প্রশ্ন এটাই যে, ‘তারা কি যন্ত্রণা ভোগ করতে পারে?
(জেরেমি বেনথাম)

৬. প্রাণীকুল আমাদের অধিকারকে সম্মান করে না। অতএব, মানুষেরও তাদের অধিকারকে সম্মান করার দায় থাকে না।

উত্তর: অনেক পরিস্থিতিতেই অধিকারভোগী ব্যক্তি অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে অসমর্থ হয়। শিশু, বাচ্চা ছেলেমেয়ে এবং অপরিণতবুদ্ধি ও মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের ক্ষেত্রে একথা সত্য। এইসব ক্ষেত্রে তারা আমাদের অধিকারকে সম্মান করে না বলে আমরা একথা বলি না যে তাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। বরং আমরা স্বীকার করি যে তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা আমাদের কর্তব্য, এমনকি যদিও আমাদের সঙ্গে একইভাবে আচরণ করার দায়িত্ব তাদের থাকে না।

শিশু, বাচ্চা ছেলেমেয়ে এবং উক্ত অন্য মানুষের ক্ষেত্রে যা সত্য, তা অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে কোনভাবেই কম সত্য নয়। এই কথা স্বীকার করলে বলা যায় যে, আমাদের অধিকারকে সম্মান করা এসব প্রাণীর দায়িত্ব নয়। কিন্তু এই কথাটি আমাদের তাদের অধিকারকে সম্মান করার দায়িত্বকে রদ বা হ্রাস করে না।

সেই সময় আসবে যখন আমার মত মানুষেরা (অন্য) প্রাণীর হত্যার বিষয়টি সেভাবেই বিবেচনা করবে যেভাবে তারা এখন মানুষের হত্যার বিষয়টি বিবেচনা করে।
(লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি)

৭. ঈশ্বর অন্য প্রাণীর উপর মানুষের কর্তৃত্ব দান করেছেন। এ কারণে আমরা তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করতে পারি, তাদেরকে খেতে পারি।

উত্তর: এমন নয় যে সকল ধর্মই মানুষকে অন্য প্রাণীর উপর কর্তৃত্বধারীরূপে উপস্থাপন করেছেন। এবং যেসব ধর্ম তা করেছে, এমনকি সেগুলোতেও ‘কর্তৃত্ব’-র ধারণাটিকে নিঃস্বার্থ অভিভাবকত্ব হিসেবে অনুধাবন করা উচিত, স্বার্থপ্রণোদিত প্রভুত্ব হিসেবে নয়। ঈশ্বরের সমগ্র সৃষ্টির প্রতি মানুষের ততটাই প্রেমশীল হওয়া উচিত যতটা প্রেমশীল ঈশ্বর তাদের সৃষ্টিকালে হয়েছিলেন। ইডেনকাননে মানুষ যেভাবে প্রাণীকুলকে ভালবাসতো, বর্তমানে আমরা যদি তাদেরকে সেভাবে ভালবাসতাম, তাহলে আমরা তাদেরকে খেতাম না। যারা প্রাণীর অধিকারকে সম্মান করে তারা ইডেনকাননের দিকে ফিরতি যাত্রারত – ঈশ্বরের সৃষ্টির প্রতি যথোপযুক্ত প্রেমের অভিমুখে ফিরতি যাত্রারত।

এবং ঈশ্বর বললেন, দেখ, আমি তোমাদেরকে প্রত্যেকটি বীজোৎপাদক গুল্ম দিয়েছি যা সমগ্র পৃথিবীপৃষ্ঠে ছড়িয়ে আছে এবং প্রত্যেকটি বৃক্ষ দিয়েছি যার মধ্যে লুকিয়ে আছে বীজোৎপাদক বৃক্ষের ফল; এটা তোমাদের কাছে মাংসের বিকল্প হয়ে থাকবে।
(জেনেসিস ১:২৯)

৮. কেবল মানুষেরই অবিনশ্বর আত্মা আছে। এটাই আমাদেরকে অন্য প্রাণীর সঙ্গে যেমন ইচ্ছা তেমন আচরণ করার অধিকার দেয়।

উত্তর: অনেক ধর্মই শিক্ষা দেয় যে, কেবল মানুষের নয়, সকল প্রাণীরই অবিনশ্বর আত্মা আছে। তবে কেবল মানুষই যদি অবিনশ্বর হয়, তাহলেও তা শুধু একথাই প্রমাণ করবে যে, আমরাই চিরজীবী আর অন্য প্রাণীরা তা নয়। এবং এই তথ্য (যদি এটা তথ্য হয়ে থাকে) আমাদের এই বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব বৃদ্ধি করবে, হ্রাস করবে না, যে এই জীবনটি – অন্য প্রাণীর একমাত্র জীবনটি – যথাসম্ভব দীর্ঘ এবং সুন্দর হোক।

প্রেমহীন কোন ধর্ম নেই, এবং মানুষ যতই তাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলুক না কেন, তা যদি তাদেরকে মানুষের প্রতি ছাড়াও অন্য প্রাণীর প্রতি মঙ্গলজনক এবং সদয় হতে না শেখায়, তাহলে তা পুরোটাই ফাঁকি।
(অ্যানা সুয়েল)

৯. যদি আমরা প্রাণীর অধিকারকে সম্মান করি এবং তাদেরকে না খাই বা অন্যভাবে কাজে না লাগাই, তাহলে তাদেরকে নিয়ে আমাদের কি করা উচিত? স্বল্পকালের মধ্যে তারা তো আমাদের রাস্তাঘাট এবং বাড়িঘরে চলতে শুরু করবে।

উত্তর: কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর খাদ্যের জন্যে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন প্রাণী উৎপাদন এবং জবাই করা হয়। এমন বিস্ময়কর সংখ্যার কারণটি সরল: সেখানকার ভোক্তারা প্রচুর পরিমাণ প্রাণী-মাংস খান। প্রাণীর যোগানে ক্রেতার চাহিদা পূরণ হয়।

কিন্তু যখন প্রাণী-অধিকার দর্শন সাফল্য লাভ করবে এবং লোকজন নিরামিষভোজী হয়ে যাবে, তখন আমাদের এই আশঙ্কা করার দরকার নেই যে বিলিয়ন বিলিয়ন গরু এবং শুকর থাকবে যারা আমাদের শহরগুলোর মাঝে এবং বৈঠকখানায় চরে বেড়াবে। একবার যদি এই বিলিয়ন বিলিয়ন প্রাণী উৎপাদনের আর্থিক প্ররোচনা দূর হয়ে যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে এত বেশি প্রাণী থাকবে না। এবং এই একই যুক্তিপ্রক্রিয়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও – যেমন গবেষণার জন্যে উৎপাদিত প্রাণীর ক্ষেত্রে – প্রযোজ্য। যখন প্রাণী-অধিকার দর্শন প্রভাব বিস্তার করবে এবং এইসব প্রাণীর এই ধরনের ব্যবহার বন্ধ হবে, তখন মিলিয়ন মিলিয়ন প্রাণী উৎপাদনের আর্থিক প্ররোচনাও থাকবে না।

আমাদের সহচর প্রাণীকুলের প্রতি সবচেয়ে বড় অপরাধ তাদেরকে ঘৃণা করা নয়, বরং তাদের প্রতি নির্লিপ্ত থাকা। এটাই অমানবিকতার মূল প্রকৃতি।
(জর্জ বার্নার্ড শ)

১০. যদি অন্য প্রাণীর নৈতিক অধিকার থেকেও থাকে এবং তাদেরকে রক্ষা করা উচিত হয়েও থাকে, তাহলেও আমাদের মনোযোগ দাবি করে এমন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে – যেমন, বিশ্ব ক্ষুধা ও শিশু নির্যাতন, বর্ণবৈষম্য, মাদক, নারীর প্রতি হিংসা, এবং গৃহহীনদের দুর্দশা। এইসব সমস্যা মোকাবিলা করার পরেই আমরা প্রাণী-অধিকার বিষয়ে ভাবতে পারি।

উত্তর: প্রাণী-অধিকার আন্দোলন মানবাধিকার আন্দোলনের অংশরূপে কাজ করে, মানবাধিকার আন্দোলনকে বাদ দিয়ে নয়। যে দর্শন মানবেতর প্রাণীর অধিকার দাবি করে এবং রক্ষা করে সেই একই দর্শন মানবাধিকারও দাবি করে এবং রক্ষা করে।

তাছাড়া, ব্যবহারিক পর্যায়ে, চিন্তাশীল মানুষ যে বিকল্প-নির্বাচনের সম্মুখীন হয় তা এটা নয় যে সে মানুষকে সাহায্য করবে নাকি অন্য প্রাণীকে। সে দুটোই করতে পারে। যেমন, শিশুদেরকে সাহায্য করতে গিয়ে প্রাণীর উপর পরখকৃত প্রসাধনদ্রব্য ব্যবহার করাটা যতটা অপ্রয়োজনীয়, গৃহহীন মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে প্রাণী খাওয়াটা ততটাই অপ্রয়োজনীয়। প্রকৃত অর্থে, মানবেতর প্রাণীকে না খাওয়ার মাধ্যমে যেসকল মানুষ তাদের অধিকারকে সম্মান করে, তারা অধিকতর স্বাস্থ্যবান হবে, যে ক্ষেত্রে তারা আসলে আরও বেশি করে মানুষকেই সাহায্য করতে পারবে।

আমি মানবাধিকার ছাড়াও প্রাণী-অধিকারের পক্ষে। এটাই হল সর্বাঙ্গীন মানুষের পথ।
(আব্রাহাম লিংকন)

Further Reading & Action

Books & Articles

  • DeGrazia, David, Animal Rights: A Very Short Introduction (Oxford: Oxford University Press, 2012)
  • Gruen, Lori, Ethics and Animals: An Introduction (Cambridge: Cambridge University Press, 2011)
  • Nobis, Nathan, Animals & Ethics 101: Thinking Critically About Animal Rights (Open Philosophy Press, 2016), freely available at animalethics101.com
  • Regan, Tom, Empty Cages: Facing the Challenge of Animal Rights (Lanham: Rowman & Littlefield, 2005)
  • Singer, Peter, Animal Liberation (New York: Harper Perennial, 2009)
  • সিঙ্গার, পিটার। (২০১২)। ব্যবহারিক নীতিবিদ্যা। অনুবাদ: প্রদীপ রায়। ঢাকা: অবসর প্রকাশনা সংস্থা।
  • ভূঁইয়া, এ. এস. এম. আনোয়ারুল্লাহ। (২০১৩)। “গবেষণাগারে অমানব-প্রাণী পরীক্ষণ: নৈতিক বিবেচনার কয়েকটি দিক”। সমাজ নিরীক্ষণ। ঢাকা: সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র। নং ১২৫, পৃ: ৩০-৫১।
  • বেগম, হাসনা। (১৯৮৪)। “মানবেতর প্রাণীর মুক্তি: নীতিবিদ্যার এক নতুন দিগন্ত,” দর্শন ও প্রগতি, জুলাই, ১৯৮৪।

Websites

Tom Regan

Facebook Group

Bangladesh Vegans & Vegetarians

Volunteer Opportunities: Animal Rights/Welfare Organizations in Bangladesh