Reasons against

প্রাণী-অধিকারের বিপক্ষে ১০টি যুক্তি এবং সেগুলোর প্রত্যুত্তর

১. আপনি প্রাণীকুল এবং মানুষকে সমতুল্য মনে করছেন যদিও বস্তুত মানুষ এবং প্রাণীকুল ভীষণভাবে ভিন্ন।

উত্তর: আমরা এটা বলছি না যে মানুষ এবং অন্য প্রাণী সকল দিক দিয়ে সমান। যেমন, আমরা এটা বলছি না যে কুকুর এবং বিড়াল ক্যালকুলাস করতে পারে, কিংবা শুকর এবং গরু কবিতা উপভোগ করতে পারে। আমরা যা বলছি তা হলো, মানুষের মত আরো অনেক প্রাণী মনস্তাত্ত্বিক জীব, যাদের রয়েছে নিজস্ব অভিজ্ঞামূলক কল্যাণ। এই অর্থে তারা এবং আমরা অভিন্ন। সুতরাং, এই অর্থে, আমাদের মধ্যকার অনেক পার্থক্য সত্ত্বেও, তারা এবং আমরা সমান।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার সমস্ত যুক্তি এই কঠোর সত্যকে নাকচ করতে পারে না যে যন্ত্রণাভোগের দিক থেকে প্রাণীকুল আমাদের সমান।
(পিটার সিঙ্গার)

২. আপনি বলছেন যে প্রত্যেক মানুষ এবং প্রতিটি অন্য প্রাণীর একই অধিকার আছে, যা উদ্ভট। মুরগির ভোটাধিকার থাকতে পারে না, শুকরেরও উচ্চশিক্ষার অধিকার থাকতে পারে না।

উত্তর: আমরা এটা বলছি না যে সকল ক্ষেত্রে মানুষ এবং অন্য প্রাণীর একই অধিকার আছে। এমনকি এটাও নয় যে সকল মানুষের একই অধিকার আছে। যেমন, গুরুতরভাবে মানসিক প্রতিবন্ধীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার থাকে না। আমরা যা বলছি তা হলো, এইসব প্রতিবন্ধী এবং অন্য মানুষের মত অন্যান্য প্রাণীরও অভিন্ন মৌলিক নৈতিক অধিকার আছে – অর্থাৎ সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার।

প্রতিটি সত্যবাণীর ভাগ্যই এমন যে, উপহাসের পাত্র হয়ে সে প্রথমে প্রকাশ পায়।
(অ্যালবার্ট স্যুইটজার)

৩. প্রাণীদের যদি অধিকার থাকে তাহলে তো শাকশব্জিরও অধিকার থাকে, যা হাস্যকর।

উত্তর: অনেক প্রাণী আমাদেরই মতো; তাদের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণ রয়েছে। কাজেই আমাদের মত এইসব প্রাণীরও সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার আছে। পক্ষান্তরে, আমাদের একথা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই, এবং নিঃসন্দেহে কোন বৈজ্ঞানিক কারণ নেই, যে গাজর ও টমেটোর মত শব্জি পৃথিবীতে কোন মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্ব নিয়ে আসতে পারে। অন্য সব শব্জির মত, গাজর ও টমেটোতেও মগজ বা কেন্দ্রীয় ¯œায়ুতন্ত্রের অনুরূপ কোন কিছু অনুপস্থিত। শব্জির মধ্যে যেহেতু এগুলো নেই, তাই শব্জিকে আনন্দ এবং বেদনার মত আবেগের অভিজ্ঞতা লাভে সমর্থ মনস্তাত্ত্বিক সত্তা বলে বিবেচনা করার কোন কারণ নেই। এইসব কারণেই কেউ প্রাণীর ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে অধিকার দাবি করতে পারেন এবং শাকশব্জির ক্ষেত্রে তা অস্বীকার করতে পারেন।

প্রাণী-অধিকার ব্যাপারটি কেবল সংবেদিতার প্রয়োজনীয়তার উপরেই নির্ভরশীল।
(এ্যানড্রু লিনজে)

৪. আপনি তাহলে কোথায় সীমারেখা টানবেন? প্রাইমেট এবং ইদুরজাতীয় প্রাণীর যদি অধিকার থাকে, তাহলে তো শামুকজাতীয় প্রাণী এবং এ্যামিবারও অধিকার থাকে, যা হাস্যকর।

উত্তর: ঠিক কোথায় ‘সীমারেখা টানতে হবে’ তা জানা প্রায়শই সহজ নয়। যেমন, কাউকে বৃদ্ধ হতে হলে ঠিক কতটা বয়স্ক হতে হবে, অথবা লম্বা হতে গেলে ঠিক কতটা দীর্ঘকায় হতে হবে তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু আমরা নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি যে যার বয়স আটাশি বছর তিনি বৃদ্ধ, এবং যার উচ্চতা সাত ফুট এক ইঞ্চি তিনি লম্বা। অনুরূপভাবে, মনস্তত্ত্বসমৃদ্ধ প্রাণীদের প্রসঙ্গ উঠলে ঠিক কোথায় সীমারেখা টানতে হবে তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে যেখানেই সীমারেখা টানা হোক না কেন, তার একদিকে (মনস্তাত্ত্বিক দিকে) থাকবে প্রাইমেট ও তীক্ষ্ণদন্ত প্রাণী এবং অন্যদিকে থাকবে শামুকজাতীয় প্রাণী ও এ্যামিবা – যার অর্থ এটা নয় যে আমরা এদেরকে নির্বিচারে হত্যা করতে পারি।

প্রাণীকুলের সঙ্গে, পুষ্পরাজির সঙ্গে, সকল সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নৈতিক আচরণবিধি রয়েছে যা আজ পর্যন্ত বিবেচনায় আনা হয় নি বললেই চলে।
(ভিক্টর হুগো)

৫. কিন্তু নিশ্চয়ই এমন কিছু প্রাণী আছে যাদের বেদনানুভূতি আছে অথচ সমন্বিত মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় নেই। যেহেতু এসব প্রাণীর সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার নেই, সেহেতু প্রাণী-অধিকার দর্শনের মতে আমরা তাদের সঙ্গে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আচরণ করতে পারি।

উত্তর: একথা সত্য যে, চিংড়ি এবং ঝিনুকজাতীয় কিছু প্রাণীর বেদনা অনুভবের সামর্থ্য থাকলেও অন্য অধিকাংশ মনস্তাত্ত্বিক সামর্থ্য নেই। একথা যদি সত্য হয়, তাহলে তাদের কিছু কিছু অধিকার থাকবে না যেগুলো অন্য প্রাণীদের আছে। কিন্তু অহেতুক কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া নৈতিকভাবে একেবারেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এবং যেহেতু চিংড়ি, ঝিনুক এবং অনুরূপ প্রাণী খাওয়া বা অন্যভাবে তাদেরকে ব্যবহার করা মানুষের জন্যে আবশ্যক নয়, তাই তাদেরকে এমন ব্যবহারের সঙ্গে অনিবার্যভাবে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রণা দেওয়ার কোন নৈতিক ন্যায্যতা থাকতে পারে না।

প্রশ্ন এটা নয় যে, ‘তারা কি বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে পারে?’ প্রশ্ন এটাও নয় যে, ‘তারা কি কথা বলতে পারে?’ বরং প্রশ্ন এটাই যে, ‘তারা কি যন্ত্রণা ভোগ করতে পারে?
(জেরেমি বেনথাম)

৬. প্রাণীকুল আমাদের অধিকারকে সম্মান করে না। অতএব, মানুষেরও তাদের অধিকারকে সম্মান করার দায় থাকে না।

উত্তর: অনেক পরিস্থিতিতেই অধিকারভোগী ব্যক্তি অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে অসমর্থ হয়। শিশু, বাচ্চা ছেলেমেয়ে এবং অপরিণতবুদ্ধি ও মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের ক্ষেত্রে একথা সত্য। এইসব ক্ষেত্রে তারা আমাদের অধিকারকে সম্মান করে না বলে আমরা একথা বলি না যে তাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। বরং আমরা স্বীকার করি যে তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা আমাদের কর্তব্য, এমনকি যদিও আমাদের সঙ্গে একইভাবে আচরণ করার দায়িত্ব তাদের থাকে না।

শিশু, বাচ্চা ছেলেমেয়ে এবং উক্ত অন্য মানুষের ক্ষেত্রে যা সত্য, তা অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে কোনভাবেই কম সত্য নয়। এই কথা স্বীকার করলে বলা যায় যে, আমাদের অধিকারকে সম্মান করা এসব প্রাণীর দায়িত্ব নয়। কিন্তু এই কথাটি আমাদের তাদের অধিকারকে সম্মান করার দায়িত্বকে রদ বা হ্রাস করে না।

সেই সময় আসবে যখন আমার মত মানুষেরা (অন্য) প্রাণীর হত্যার বিষয়টি সেভাবেই বিবেচনা করবে যেভাবে তারা এখন মানুষের হত্যার বিষয়টি বিবেচনা করে।
(লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি)

৭. ঈশ্বর অন্য প্রাণীর উপর মানুষের কর্তৃত্ব দান করেছেন। এ কারণে আমরা তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করতে পারি, তাদেরকে খেতে পারি।

উত্তর: এমন নয় যে সকল ধর্মই মানুষকে অন্য প্রাণীর উপর কর্তৃত্বধারীরূপে উপস্থাপন করেছেন। এবং যেসব ধর্ম তা করেছে, এমনকি সেগুলোতেও ‘কর্তৃত্ব’-র ধারণাটিকে নিঃস্বার্থ অভিভাবকত্ব হিসেবে অনুধাবন করা উচিত, স্বার্থপ্রণোদিত প্রভুত্ব হিসেবে নয়। ঈশ্বরের সমগ্র সৃষ্টির প্রতি মানুষের ততটাই প্রেমশীল হওয়া উচিত যতটা প্রেমশীল ঈশ্বর তাদের সৃষ্টিকালে হয়েছিলেন। ইডেনকাননে মানুষ যেভাবে প্রাণীকুলকে ভালবাসতো, বর্তমানে আমরা যদি তাদেরকে সেভাবে ভালবাসতাম, তাহলে আমরা তাদেরকে খেতাম না। যারা প্রাণীর অধিকারকে সম্মান করে তারা ইডেনকাননের দিকে ফিরতি যাত্রারত – ঈশ্বরের সৃষ্টির প্রতি যথোপযুক্ত প্রেমের অভিমুখে ফিরতি যাত্রারত।

এবং ঈশ্বর বললেন, দেখ, আমি তোমাদেরকে প্রত্যেকটি বীজোৎপাদক গুল্ম দিয়েছি যা সমগ্র পৃথিবীপৃষ্ঠে ছড়িয়ে আছে এবং প্রত্যেকটি বৃক্ষ দিয়েছি যার মধ্যে লুকিয়ে আছে বীজোৎপাদক বৃক্ষের ফল; এটা তোমাদের কাছে মাংসের বিকল্প হয়ে থাকবে।
(জেনেসিস ১:২৯)

৮. কেবল মানুষেরই অবিনশ্বর আত্মা আছে। এটাই আমাদেরকে অন্য প্রাণীর সঙ্গে যেমন ইচ্ছা তেমন আচরণ করার অধিকার দেয়।

উত্তর: অনেক ধর্মই শিক্ষা দেয় যে, কেবল মানুষের নয়, সকল প্রাণীরই অবিনশ্বর আত্মা আছে। তবে কেবল মানুষই যদি অবিনশ্বর হয়, তাহলেও তা শুধু একথাই প্রমাণ করবে যে, আমরাই চিরজীবী আর অন্য প্রাণীরা তা নয়। এবং এই তথ্য (যদি এটা তথ্য হয়ে থাকে) আমাদের এই বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব বৃদ্ধি করবে, হ্রাস করবে না, যে এই জীবনটি – অন্য প্রাণীর একমাত্র জীবনটি – যথাসম্ভব দীর্ঘ এবং সুন্দর হোক।

প্রেমহীন কোন ধর্ম নেই, এবং মানুষ যতই তাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলুক না কেন, তা যদি তাদেরকে মানুষের প্রতি ছাড়াও অন্য প্রাণীর প্রতি মঙ্গলজনক এবং সদয় হতে না শেখায়, তাহলে তা পুরোটাই ফাঁকি।
(অ্যানা সুয়েল)

৯. যদি আমরা প্রাণীর অধিকারকে সম্মান করি এবং তাদেরকে না খাই বা অন্যভাবে কাজে না লাগাই, তাহলে তাদেরকে নিয়ে আমাদের কি করা উচিত? স্বল্পকালের মধ্যে তারা তো আমাদের রাস্তাঘাট এবং বাড়িঘরে চলতে শুরু করবে।

উত্তর: কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর খাদ্যের জন্যে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন প্রাণী উৎপাদন এবং জবাই করা হয়। এমন বিস্ময়কর সংখ্যার কারণটি সরল: সেখানকার ভোক্তারা প্রচুর পরিমাণ প্রাণী-মাংস খান। প্রাণীর যোগানে ক্রেতার চাহিদা পূরণ হয়।

কিন্তু যখন প্রাণী-অধিকার দর্শন সাফল্য লাভ করবে এবং লোকজন নিরামিষভোজী হয়ে যাবে, তখন আমাদের এই আশঙ্কা করার দরকার নেই যে বিলিয়ন বিলিয়ন গরু এবং শুকর থাকবে যারা আমাদের শহরগুলোর মাঝে এবং বৈঠকখানায় চরে বেড়াবে। একবার যদি এই বিলিয়ন বিলিয়ন প্রাণী উৎপাদনের আর্থিক প্ররোচনা দূর হয়ে যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে এত বেশি প্রাণী থাকবে না। এবং এই একই যুক্তিপ্রক্রিয়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও – যেমন গবেষণার জন্যে উৎপাদিত প্রাণীর ক্ষেত্রে – প্রযোজ্য। যখন প্রাণী-অধিকার দর্শন প্রভাব বিস্তার করবে এবং এইসব প্রাণীর এই ধরনের ব্যবহার বন্ধ হবে, তখন মিলিয়ন মিলিয়ন প্রাণী উৎপাদনের আর্থিক প্ররোচনাও থাকবে না।

আমাদের সহচর প্রাণীকুলের প্রতি সবচেয়ে বড় অপরাধ তাদেরকে ঘৃণা করা নয়, বরং তাদের প্রতি নির্লিপ্ত থাকা। এটাই অমানবিকতার মূল প্রকৃতি।
(জর্জ বার্নার্ড শ)

১০. যদি অন্য প্রাণীর নৈতিক অধিকার থেকেও থাকে এবং তাদেরকে রক্ষা করা উচিত হয়েও থাকে, তাহলেও আমাদের মনোযোগ দাবি করে এমন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে – যেমন, বিশ্ব ক্ষুধা ও শিশু নির্যাতন, বর্ণবৈষম্য, মাদক, নারীর প্রতি হিংসা, এবং গৃহহীনদের দুর্দশা। এইসব সমস্যা মোকাবিলা করার পরেই আমরা প্রাণী-অধিকার বিষয়ে ভাবতে পারি।

উত্তর: প্রাণী-অধিকার আন্দোলন মানবাধিকার আন্দোলনের অংশরূপে কাজ করে, মানবাধিকার আন্দোলনকে বাদ দিয়ে নয়। যে দর্শন মানবেতর প্রাণীর অধিকার দাবি করে এবং রক্ষা করে সেই একই দর্শন মানবাধিকারও দাবি করে এবং রক্ষা করে।

তাছাড়া, ব্যবহারিক পর্যায়ে, চিন্তাশীল মানুষ যে বিকল্প-নির্বাচনের সম্মুখীন হয় তা এটা নয় যে সে মানুষকে সাহায্য করবে নাকি অন্য প্রাণীকে। সে দুটোই করতে পারে। যেমন, শিশুদেরকে সাহায্য করতে গিয়ে প্রাণীর উপর পরখকৃত প্রসাধনদ্রব্য ব্যবহার করাটা যতটা অপ্রয়োজনীয়, গৃহহীন মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে প্রাণী খাওয়াটা ততটাই অপ্রয়োজনীয়। প্রকৃত অর্থে, মানবেতর প্রাণীকে না খাওয়ার মাধ্যমে যেসকল মানুষ তাদের অধিকারকে সম্মান করে, তারা অধিকতর স্বাস্থ্যবান হবে, যে ক্ষেত্রে তারা আসলে আরও বেশি করে মানুষকেই সাহায্য করতে পারবে।

আমি মানবাধিকার ছাড়াও প্রাণী-অধিকারের পক্ষে। এটাই হল সর্বাঙ্গীন মানুষের পথ।
(আব্রাহাম লিংকন)