Reasons for

প্রাণী-অধিকারের পক্ষে ১০টি যুক্তি এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা

১. প্রাণী-অধিকার দর্শন যৌক্তিক।

ব্যাখ্যা: যথেচ্ছভাবে বৈষম্য নির্ধারণ করা অযৌক্তিক, এবং মানবেতর প্রাণীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ স্বেচ্ছাচারমূলক। দুর্বলতর মানুষের সঙ্গে, বিশেষত যাদের স্বাভাবিক মানব বুদ্ধিমত্তা নেই তাদের সঙ্গে, এমনভাবে আচরণ করা অন্যায় যাতে মনে হয় যে তারা আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের ‘হাতিয়ার’ বা ‘নবায়নযোগ্য কাঁচামাল’ বা ‘মডেল’ বা ‘পণ্য’। কাজেই, অন্যান্য প্রাণীকে ‘হাতিয়ার’ বা ‘মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে সেইমত আচরণ করা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না যদি তাদের মনস্তত্ত্ব এইসব মানুষের মত উন্নত (বা তাদের চেয়ে উন্নততর) হয়। অন্যভাবে চিন্তা করা অযৌক্তিক।

কোন প্রাণীকে চরম জটিল এক ভৌত-রাসায়নিক কাঠামো বলে অভিহিত করা নিশ্চয়ই সম্পূর্ণরূপে সঠিক, যদি না এই অভিধা প্রাণীটির ‘প্রাণীত্ব’-কে উপেক্ষা করে।
(ই. এফ. সুমাখার)

২. প্রাণী-অধিকার দর্শন বিজ্ঞানসম্মত।

ব্যাখ্যা: প্রাণী-অধিকার দর্শন সামগ্রিকভাবে আমাদের উৎকৃষ্টতম বিজ্ঞানের প্রতি এবং বিশেষভাবে বিবর্তন জীববিদ্যার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ডারউইনের ভাষায়, বিবর্তন জীববিদ্যা শেখায় যে, মানুষ অন্য প্রাণী থেকে মাত্রাগতভাবে ভিন্ন, জাতিগতভাবে নয়। ভেদরেখাসংক্রান্ত প্রশ্নমালা একপাশে সরিয়ে রাখলে, এটা সুস্পষ্ট যে, অন্য প্রাণীদের মত, গবেষণাগারে ব্যবহৃত বা খাদ্যের জন্যে পালিত প্রাণীরা, এবং ফূর্তির জন্যে শিকারকৃত বা মুনাফার জন্যে ফাঁদে ধরা প্রাণীরা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞাতি। এটা কোন অবাস্তব কল্পনা নয়, এটা আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত বাস্তবতা।

মানসিক বৃত্তির দিক থেকে মানুষ এবং উন্নততর স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই।
(চার্লস ডারউইন)

৩. প্রাণী-অধিকার দর্শন পক্ষপাতমুক্ত।

ব্যাখ্যা: জাতিবাদী হলো সেইসব লোক যারা মনে করে যে তাদের জাতির সদস্যরা কেবল তাদের (“উৎকৃষ্টতর”) জাতিটির অন্তর্ভুক্ত বলেই অন্য সকল জাতির সদস্যদের তুলনায় উৎকৃষ্টতর। লিঙ্গবাদীরা বিশ্বাস করে যে তাদের লিঙ্গগোষ্ঠীর সদস্যরা শুধু তাদের (‘উৎকৃষ্টতর’) লিঙ্গটির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণেই বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের চেয়ে উৎকৃষ্টতর। জাতিবাদ এবং লিঙ্গবাদ উভয়ই অসমর্থনীয় গোঁড়ামির দৃষ্টান্ত। কোন “উৎকৃষ্টতর’’ বা “নিকৃষ্টতর’’ লিঙ্গগোষ্ঠী বা জাতি নেই। জাতিগত বা লৈঙ্গিক পার্থক্য আসলে জৈবিক পার্থক্য, নীতিগত পার্থক্য নয়।

প্রজাতিবাদ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য যে মতবাদ মনে করে হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির সদস্যরা অন্য প্রত্যেক প্রজাতির সদস্যদের তুলনায় উৎকৃষ্টতর কেবল এই কারণে যে মানুষ তার নিজের (‘উৎকৃষ্টতর’) প্রজাতিভুক্ত। অন্যভাবে চিন্তা করা জাতিবাদী বা লিঙ্গবাদীর তুলনায় কম পক্ষপাতদুষ্ট হবে না।

আপনি যদি মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে কৃত হত্যাকে ন্যায্য প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আপনি ঘেটোর (ghetto) দুর্দশাকেও ন্যায্য বলে প্রমাণ করতে পারেন। আমি কোনটির ন্যায্যতাই প্রমাণ করতে পারি না।
(ডিক গ্রেগরি)

৪. প্রাণী-অধিকার দর্শন ন্যায়সম্মত।

ব্যাখ্যা: ন্যায় হলো নীতিবিদ্যার পরম আদর্শ। কারও উপকার হতে পারে বলে আমরা অন্যায় করতে পারি না বা অন্যায় হতে দিতে পারি না। তেমনি অনেকে উপকৃত হতে পারে মনে করে আমরা কতিপয়ের অধিকার লঙ্ঘন করতে পারি না। ক্রীতদাসপ্রথায় এই অধিকার-লঙ্ঘন হয়েছিলো। শিশুশ্রমব্যবস্থাও এটা অনুমোদন করেছিলো। সামাজিক অন্যায়ের অধিকাংশ দৃষ্টান্তে এটাই ঘটেছিলো। কিন্তু যার পরম আদর্শ ন্যায়ের আদর্শ, সেই প্রাণী-অধিকার দর্শন এই অন্যায় হতে দিতে পারে না: অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে উপকৃত হওয়ার অধিকার কারও নেই, তা সেই ‘অন্য’ কোন মানুষ হোক বা অন্য কোন প্রাণী।

শিশুদের অনুকূলে আইনগত হস্তক্ষেপের কারণগুলো সমান যথাযোগ্যভাবেই সেইসব হতভাগ্য দাসদের – (অন্য) প্রাণীদের – ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
(জন স্টুয়ার্ট মিল)

৫. প্রাণী-অধিকার দর্শন করুণাপূর্ণ।

ব্যাখ্যা: একটি যথার্থ মানবজীবনের জন্যে অপরিহার্য হলো অন্যায়ের ফলে ভুক্তভোগী যারা, ভুক্তভোগীরা মানুষ হোক বা অন্য প্রাণী, তাদের প্রতি অনুকম্পা ও সহানুভূতি – এক কথায়, সহমর্মিতা – প্রকাশ করা। প্রাণী-অধিকার দর্শন সহমর্মিতা নামক সদ্গুণের দাবি করে এবং এই দর্শন গ্রহণ সদ্গুণটির ক্রমবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। লিঙ্কনের ভাষায় বলতে গেলে, এই দর্শন “একজন পরিপূর্ণ মানুষের জীবনরীতি”।

কর্মে সহৃদয়তা হতে পারে সেই অসামান্য সম্ভাবনা যা আমাদের এই জনাকীর্ণ, কলুষিত গ্রহকে রক্ষা করতে পারবে।
(ভিক্টোরিয়া মোর‌্যান)

৬. প্রাণী-অধিকার দর্শন নিঃস্বার্থ।

ব্যাখ্যা: যারা দুর্বল ও অসহায়, মানুষ হোক বা অন্য প্রাণী, যাদের নিজেদের পক্ষে কথা বলার বা নিজেদেরকে রক্ষা করার সামর্থ্য নেই, এবং মানুষের লোভ ও নিষ্ঠুরতা থেকে যাদের সুরক্ষা দরকার তাদেরকে সেবা করার অঙ্গীকার প্রাণী-অধিকার দর্শনের দাবি। এই দর্শন এই অঙ্গীকারের দাবি করে, এই কারণে নয় যে এই অঙ্গীকার আমাদের আত্ম-স্বার্থসহায়ক, বরং এই কারণে যে এটাই ন্যায়সঙ্গত। এই দর্শন তাই নিঃস্বার্থ সেবাকর্মের দাবি করে, এবং এই দর্শন গ্রহণ তাই নিঃস্বার্থ সেবাকর্মের ক্রমবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে।

আমাদের এমন একটি নীতিদর্শন দরকার যেখানে, বর্তমানে দার্শনিকদের দ্বারা প্রায় অনুল্লিখিত, প্রেমের নীতিকে আবার প্রধান নীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
(আইরিশ মারডক)

৭. প্রাণী-অধিকার দর্শন ব্যক্তির পূর্ণবিকাশে সহায়ক।

ব্যাখ্যা: নীতিবিদ্যার সকল গুরুত্বপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয়, ধারা চারটি বিষয়ের উপর জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করে: জ্ঞান, ন্যায়, সহমর্মিতা এবং স্বশাসন। প্রাণী-অধিকার দর্শন কোন ব্যতিক্রম নয়। এই দর্শন আমাদেরকে এটা শিক্ষা দেয় যে আমাদের বিকল্প-নির্বাচনগুলো জ্ঞানভিত্তিক হওয়া উচিত, সহমর্মিতা ও ন্যায়কে প্রকাশ করা উচিত, এবং স্বাধীন হওয়া উচিত। এইসব সদ্গুন অর্জন করা, এবং লোভ ও নির্লিপ্ততার প্রতি মানুষের সহজপ্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। কিন্তু এগুলো ছাড়া সার্বিক মানব জীবন সম্ভব নয়। প্রাণী-অধিকার দর্শন ব্যক্তির পূর্ণ আত্মবিকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, এবং এই দর্শন গ্রহণ ব্যক্তির পূর্ণ আত্মবিকাশের ক্রমোন্নতির সহায়ক।

মানবিকতা কোনো মৃত আরোপিত নিয়ম নয়, বরং অন্তরের প্রাণবন্ত প্রবৃত্তি; আত্ম-বিসর্জন নয়, বরং পূর্ণ আত্মবিকাশ।
(হেনরি সল্ট)

৮. প্রাণী-অধিকার দর্শন সামাজিকভাবে প্রগতিশীল।

ব্যাখ্যা: মানব সমাজের বিকাশের পথে বৃহত্তম প্রতিবন্ধক হলো মানুষের হাতে অন্য প্রাণীর শোষণ। এই কথা অস্বাস্থ্যকর খাবার, বিজ্ঞানে ‘সম্পূর্ণ প্রাণী মডেলের’ উপর অভ্যাসগত নির্ভরশীলতা, এবং প্রাণী শোষণের আরো অনেক রূপের ক্ষেত্রে সত্য। এবং শিক্ষা ও বিজ্ঞাপনের মত দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রেও এই কথা একইভাবে সত্য, যেগুলো মানবাত্মাকে যুক্তি, নিরপেক্ষতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়ের দাবির প্রতি সংবেদনহীন করতে প্ররোচিত করে। এই সকল (এবং ততোধিক) প্রকারে, জাতিসমূহ ভীষণভাবে পশ্চাৎপদ থেকে যায়, কারণ তারা তাদের নাগরিকদের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করতে পারে না।

কোন জাতি তার প্রাণীদের প্রতি কেমন আচরণ করে তার দ্বারা ঐ জাতির মহত্ত্ব এবং নৈতিক প্রগতি পরিমাপ করা যায়।
(মহাত্মা গান্ধী)

৯. প্রাণী-অধিকার দর্শন পরিবেশের দিক থেকে সুবিবেচক।

ব্যাখ্যা: পরিবেশের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত কার যায় প্রাণীর শোষণকে; এবং এই অবনতির দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া, পাণি দূষণ, এবং আবাদী জমি ও উপরিস্তরের উর্বর মাটির বিনাশকে অন্তর্ভূক্ত করা যায়। এই একই ধারা বিদ্যমান রয়েছে পরিবেশগত সমস্যার বিস্তৃত পরিসর জুড়ে, অম্ল বৃষ্টি এবং সমুদ্রে বিষাক্ত বর্জ্য নিক্ষেপ থেকে শুরু করে বায়ু দূষণ এবং প্রাকৃতিক বসতির বিনাশ পর্যন্ত। এই সকল ক্ষেত্রে, আক্রান্ত প্রাণীদেরকে (পরিবেশের বিপর্যয়ে তারাই তো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মারা যায়) রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করার অর্থ হলো পৃথিবীকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করা।

এই যন্ত্রণাগ্রস্ত গ্রহপৃষ্ঠে জীবনের রৌদ্র-ছায়াকে যারা আমাদের সঙ্গে যৌথভাবে উপভোগ করে, সেই নশ্বর সঙ্গী-প্রাণীকুল এবং আমাদের নিজেদের প্রজাতির মধ্যে যতক্ষণ না আমরা উপলব্ধিজাত জ্ঞাতিত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, ততক্ষণ অন্যান্য প্রজাতির কোন আশা-ভরসা নেই, পরিবেশের কোন আশা-ভরসা নেই, এবং আমাদের নিজেদেরও কোন আশা-ভরসা নেই।
(জন ওয়েন-টাইসন)

১০. প্রাণী-অধিকার দর্শন শান্তিপ্রিয়।

ব্যাখ্যা: প্রাণী-অধিকার দর্শনের মৌলিক দাবি হলো মানুষ এবং অন্য প্রাণীকুলের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা। এই আচরণের দাবি হলো আমরা নিজেরা বা অন্যরা উপকৃত হতে পারে কেবল এই কারণে যেন আমরা অন্যের ক্ষতি না করি। এই দর্শন তাই সামরিক আগ্রাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা শান্তির দর্শন। কিন্তু এটা এমন একটা দর্শন যার শান্তির দাবি আমাদের প্রজাতির সীমারেখা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কারণ, লক্ষ লক্ষ অগণিত মানবেতর প্রাণীর বিরুদ্ধে প্রতিদিন যুদ্ধ চালানো হচ্ছে। তাই, প্রকৃত অর্থে শান্তির পক্ষে অবস্থান করার অর্থ হলো প্রজাতিবাদের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় অবস্থান। অন্য প্রাণীকুলের সঙ্গে আমাদের আচরণ যদি আমরা বন্ধুভাবাপন্ন করতে না পারি, তাহলে এটা বিশ্বাস করা অবাস্তব স্বপ্নকল্পনা হবে যে, পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করতে পারে।

আমাদের জীবনসংগ্রামে কোন অলৌকিক উপায়ে পৃথিবী যদি পারমাণবিক বিপর্যয়ের থেকে রেহাইও পায়, তাহলে প্রত্যেক জীবের প্রতি ন্যায়ই কেবল মানবপ্রজাতিকে রক্ষা করতে পারবে।
(এ্যালিস ওয়াকার)