Animal Rights

প্রাণী-অধিকার দৃষ্টিভঙ্গি

অন্য যেসব প্রাণীকে মানুষ খায়, বিজ্ঞানে ব্যবহার করে, শিকার করে, ফাঁদ পেতে ধরে এবং বিচিত্র উপায়ে শোষণ করে, আমাদের কাছে তাদের উপযোগিতা ছাড়াও তাদের একটি স্বকীয় জীবন রয়েছে যা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে শুধু পৃথিবীর মাঝে অস্তিত্বশীল তা-ই নয়, তারা এ ব্যাপারে অবগতও বটে। তাদের জীবনে যা ঘটে তা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের একটি জীবন আছে যা জীবনধারীর কাছে উৎকৃষ্টতর বা নিকৃষ্টতররূপে প্রতিভাত হতে পারে।

সেই জীবনে আছে বিবিধ জৈবিক, ব্যক্তিক এবং সামাজিক চাহিদা। এসব চাহিদা পূরণ হলে তারা আনন্দ পায়, পূরণ না হলে বা তাদের অপপ্রয়োগ হলে তারা বেদনা অনুভব করে। এসকল মৌলিক দিক বিবেচনায়, অন্যদের মত, গবেষণাগার ও খামারের মানবেতর প্রাণী এবং মানুষ একইরকম। এবং একারণেই তাদের সঙ্গে এবং আমাদের পরস্পরের সঙ্গে আমাদের আচরণের ক্ষেত্রে অভিন্ন মৌলিক নৈতিক নীতি স্বীকার করে নিতে হবে।

মানব নীতিবিদ্যা, এর গভীরতম স্তরে, ব্যক্তির স্বতন্ত্র মূল্যের উপর প্রতিষ্ঠিত; কোন একজন মানুষ অন্য মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে কতটা দরকারী তা দিয়ে ঐ মানুষটির নৈতিক মূল্য পরিমাপ করা যায় না। মানুষের স্বতন্ত্র মূল্যের জন্যে সম্মানজনক নয় এমন কোনভাবে তার সঙ্গে আচরণ করার অর্থ হলো সেই মৌলিকতম মানবাধিকার  –  প্রত্যেক ব্যক্তির সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার  –  লঙ্ঘন করা।

প্রাণী-অধিকার দর্শন কেবল এই দাবি করে যে যুক্তিকে সম্মান দেওয়া হোক। কারণ যে যুক্তি মানুষের স্বতন্ত্র মূল্যকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে, সেরকম যেকোন যুক্তি এই ইঙ্গিত করে যে অন্য প্রাণীরও এই একই মূল্য আছে, এবং সমানভাবে আছে। এবং যে যুক্তি মানুষের সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকারকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে, সেরকম যেকোন যুক্তি এই ইঙ্গিতও দেয় যে অন্য প্রাণীকুলেরও এই একই অধিকার আছে, এবং সমভাবেই আছে।

অতএব, একথা সত্য যে, নারীর অস্তিত্ব পুরুষের সেবাদাসী হওয়ার জন্যে নয়, কৃষ্ণাঙ্গের জন্ম শ্বেতাঙ্গের সেবার্থে নয়, দরিদ্রের অস্তিত্ব ধনীর গোলামি করার জন্যে নয়, অথবা দুর্বলের জীবন সবলের সেবা করার জন্যে নয়। প্রাণী-অধিকার দর্শন যে কেবল এসব সত্য স্বীকার করে তা-ই নয়, বরং এগুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং এগুলোর ন্যায্যতা প্রমাণ করে। কিন্তু এই দর্শন আরো বেশি কিছু করে। অন্য প্রাণীর স্বতন্ত্র মূল্য ও অধিকারের উপর গুরুত্বারোপ ও সেগুলোর ন্যায্যতা প্রমাণ করার মাধ্যমে এই দর্শন বিজ্ঞানের তথ্যসমৃদ্ধ এবং নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ যুক্তিমালা প্রদর্শন করে এবং, ফলত, একথা অসত্য বলে ঘোষণা করে যে এসব প্রাণী আমাদের সেবা করার উদ্দেশ্যে অস্তিত্বশীল।

এই সত্য একবার স্বীকার করে নিলে একথা সহজবোধ্য হয় কেন প্রাণী-অধিকার দর্শন অন্য প্রাণীকুলের উপর চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যেকটি অন্যায়ের প্রতিবাদে অবিচল। ন্যায়ের দাবি এটা নয় যে বিজ্ঞানের মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রাণীদের জন্যে খাঁচা হোক বৃহত্তর ও অধিকতর পরিচ্ছন্ন, বরং ন্যায়ের দাবি শূন্য খাঁচা; ন্যায়ের দাবি “প্রথাগত” প্রাণীপালন নয়, বরং মৃত প্রাণীর মাংসের সকল রকম বাণিজ্যের সম্পূর্ণ সমাপ্তি; “অধিকতর সহানুভূতিশীল” শিকারকরণ এবং ফাঁদবদ্ধকরণ নয়, বরং এইসব বর্বরোচিত রেওয়াজের সামগ্রিক নির্মূলীকরণ।

কারণ যখন কোন অন্যায় চরমে ওঠে, তখন সর্বশক্তি দিয়ে তাকে প্রতিরোধ করতে হয়। ন্যায়ের যা দাবি ছিল তা “শোধিত” দাসপ্রথা নয়, “শোধিত” শিশুশ্রম নয়, নয় নারীর “শোধিত” পীড়ন। এসব ক্ষেত্রের প্রত্যেকটিতে, বিলুপ্তিসাধনই ছিল একমাত্র নৈতিক সমাধান। চরম অন্যায়কে কেবল শোধন করার অর্থ হল অন্যায়কে দীর্ঘায়িত করা।

অন্য প্রাণীকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগানোর প্রতিবাদে প্রাণী-অধিকার দর্শনের দাবি এই একই সমাধান – বিলুপ্তিসাধন। অন্যায়ভাবে কাজে লাগানোর দিকগুলি পরিবর্তন করলেই চলবে না। অন্যায়ভাবে কাজে লাগানোটাই উচ্ছেদ করতে হবে, তা সেই অন্যায় খামারে হোক, গবেষণাগারে হোক বা অরণ্যে হোক। প্রাণী-অধিকার দর্শন আর কিছু দাবি করে না, তবে এই দর্শন এর চেয়ে কম কিছুতেও সন্তুষ্ট হবে না।